পাবনায় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

পাবনায় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
পাবনা জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ । ১০:৪৫ অপরাহ্ণ

পাবনায় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়ের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

মাদকমুক্ত সমাজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মাঠে থাকার কথা যাদের, সেই পাবনা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই উঠেছে সাপ্তাহিক চাঁদা গ্রহণের বিস্ফোরক অভিযোগ। স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র দাবি করছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সাপ্তাহিক টাকা নিয়ে তাদের ব্যবসা চালাতে সহায়তা করা হচ্ছে—আর সেটি চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মহেন্দ্রপুর, বলরামপুর, সাধুপাড়া, দিলালপুর টেকনিক্যাল মোড় ও টেবুনিয়া—এই এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে একধরনের “চাঁদা-নির্ভর মাদক ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক” তৈরি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। সূত্র জানায়—মহেন্দ্রপুরের একজন হিরোইন ব্যবসায়ী সাপ্তাহিক ৩,০০০ টাকা, একই এলাকার গাঁজা ব্যবসায়ী আলম ২,০০০ টাকা, আরেকজন আখি ৪,০০০ টাকা দেন। বলরামপুরে ‘বিন্দু মাসি’ নামে পরিচিত নারী মাদক ব্যবসায়ী allegedly সাপ্তাহিক ৫,০০০ টাকা পরিশোধ করেন। সাধুপাড়ার রুমনের স্ত্রী মুন্নির কাছ থেকে নেওয়া হয় ৪,০০০ টাকা। দিলালপুর টেকনিক্যাল মোড় ও টেবুনিয়ার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ২,০০০ টাকাসহ পাবনার বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দুই থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নিয়ে থাকেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো—এই টাকার বড় অংশ লেনদেন হয় পাবনা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে ফারুক স্টোরের একটি বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে। স্থানীয়দের দাবি, এই পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেন করলে অনেক সময় প্রমাণ রেখে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না, আর সেই সুযোগই ব্যবহার করছে চক্রটি।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী—এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের পাবনার কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে। যাদের নাম স্থানীয়দের মুখে শোনা গেছে তারা হলেন—এএসআই কামরুজ্জামান সাগর, এএসআই মিনা পারভিন, সিপাই রাসেল এবং এসআই জামালুর রহমান। অভিযোগকারীরা বলছেন, এই কর্মকর্তাদের ‘মৌন সম্মতি’তে মাদক ব্যবসাগুলো বাধাহীনভাবে চলছে, আর ব্যবসায়ীরাও এই নিয়মিত চাঁদা দিয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবছেন। বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়,মানুষের মাঝে প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ।

একজন ক্ষুব্ধ বাসিন্দা বলেন, যারা মানুষের ভবিষ্যৎ বাঁচাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালাবে, যদি তারাই টাকার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীদের রক্ষা করে,তাহলে আমরা ন্যায়বিচার চাইতে কোথায় যাব? মাসের পর মাস কোনো বড় অভিযান নেই, কিন্তু টাকার লেনদেন থেমে নেই। এটা মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ।

অভিযোগ আরও আছে—মাদকবিরোধী অভিযান যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করে দেওয়া হয়েছে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হলেও অভিযান নেই, তৎপরতা নেই, নেই কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ। এতে স্থানীয়দের মধ্যে আরও সন্দেহ তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি অভিযোগের দিকেই ইঙ্গিত করে।

বিকাশ এজেন্টের লেনদেন ঘিরে আরও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় অনুসন্ধানে দেখা যায়,সেখানে প্রতিদিনই বিভিন্ন লোকজনের আসা–যাওয়া, লেনদেনের ধরনও অস্বাভাবিক। অনেক লেনদেন নগদ জমা, আর ব্যবহার করা ফোন নম্বরগুলোর বেশিরভাগই অনুসন্ধানে ট্রেস করা কঠিন হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কারো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতায় অভিযোগের সত্যতা নিয়ে আরও প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি জনমনে অনাস্থাও বাড়ছে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন,এই অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়, তবে এটি শুধু দুর্নীতি নয়; বরং মাদকবিরোধী সংগ্রামকে ধ্বংস করার মতো গুরুতর অপরাধ। তাদের দাবি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে উচ্চ পর্যায়ের স্বচ্ছ তদন্ত, অভিযুক্তদের লেনদেন-তথ্য যাচাই, এবং দ্রুত মাদকবিরোধী অভিযান পুনরায় চালু করা।

এই পরিস্থিতিতে পাবনার মানুষ একটাই কথা বলছেন,
মাদক নির্মূলের দায়িত্ব যাদের হাতে, তারা যদি নিজেই মাদক ব্যবসার অংশে পরিণত হন, তবে সমাজকে রক্ষা করবে কে?

প্রধান সম্পাদক :  নাহিদুজ্জামান , সম্পাদক : আখি আক্তার , প্রকাশক:  আদনান হাসান আনন্ত । ফোন : ০১৭৮২৮১৮৮৭২ , ই-মেইল : bdnewws26@gmail.com, কপিরাইট © বিডি নিউজ২৬ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন