গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিপুল জয়: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত

গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিপুল জয়: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১০:৩১ অপরাহ্ণ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিপুল জয়: দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত

দেশের শাসন কাঠামোয় ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বার খুলে দিয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় গণভোট। ভোটারদের বিপুল সমর্থনে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংশোধন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং একাধিক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার গণভোটে অংশ নেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন এবং ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন। ফলে বড় ব্যবধানে প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন

জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো জাতীয় সংসদকে দুই কক্ষে বিভক্ত করা। বিদ্যমান নিম্নকক্ষের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যা দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে গঠিত হবে। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।

বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার

সংবিধান সংশোধনের পর সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবে। এটি সংসদীয় কার্যক্রমে ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি

বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি থাকলেও ধাপে ধাপে তা বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এর ফলে জাতীয় সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন

বর্তমান বিধান অনুযায়ী দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয়। নতুন সংশোধনীতে অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ সদস্যরা দলীয় অবস্থানের বাইরে ভোট দিতে পারবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পুনরায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করা হবে। সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা ভেঙে গেলে ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন, বিশেষ পরিস্থিতিতে তা আরও ৩০ দিন বাড়ানো যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট

নতুন বিধান অনুযায়ী একজন ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। একই সঙ্গে জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং মৌলিক অধিকার খর্ব না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও অভিশংসন

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট চালু হবে এবং উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যরা যৌথভাবে ভোট দেবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিয়োগ

নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে পৃথক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। বিচার বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যেখানে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের ভূমিকা বাড়ানো হয়েছে।

মৌলিক অধিকার ও নতুন সংযোজন

সংবিধানে বিদ্যমান ২২টি মৌলিক অধিকারের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সেবা ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। নাগরিক পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশি’ করার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতিও যুক্ত করা হয়েছে।

বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট

জুলাই সনদের কয়েকটি ধারায় বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে, বিশেষ করে সরকার প্রধান ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি না থাকার বিধান এবং কিছু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে। তবে গণভোটে জনগণের রায়ে প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগোবে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

দেশের ইতিহাসে এটি চতুর্থ গণভোট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই গণভোট সরকারের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী না হলে পুরো সনদের আইনি ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারত।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আসবে, যা ক্ষমতার ভারসাম্য, জবাবদিহিতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

প্রধান সম্পাদক :  নাহিদুজ্জামান , সম্পাদক : আখি আক্তার , প্রকাশক:  আদনান হাসান আনন্ত । ফোন : ০১৭৮২৮১৮৮৭২ , ই-মেইল : bdnewws26@gmail.com, কপিরাইট © বিডি নিউজ২৬ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন