লোডশেডিংয়ে রেকর্ড! দেশের অনেক এলাকায় ১০ ঘণ্টাও থাকছে না বিদ্যুৎ
তীব্র গরমের মধ্যে দেশে বিদ্যুৎ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে ও রাতে মিলিয়ে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টার দিকে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি
পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, রোববার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট।
পরবর্তী সময়ে বিকেল ৫টার দিকে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে প্রায় ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও তখনও প্রায় ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
কমেছে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ
ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। সাধারণত পিক আওয়ারে সেখান থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও রোববার বিকেল ৫টার দিকে সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৮১৫ মেগাওয়াটে।
পিডিবির কাছে আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। এর ফলে কেন্দ্রটিতে কয়লার মজুত কমে যাওয়ায় উৎপাদন হ্রাস করা হয়েছে।
তবে আদানির দেওয়া কারণ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি পিডিবি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগ না থাকায় আপাতত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।
কয়লা সংকটেও কমছে উৎপাদন
শুধু আদানি নয়, দেশের কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কম রয়েছে। কয়লার ঘাটতি ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপালসহ কয়েকটি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্ধ ছিল। পরে রাতে সেটি চালু হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট হলেও ওই সময়ে উৎপাদন ছিল প্রায় ৭১০ মেগাওয়াট।
ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট থেকেও উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। একইভাবে এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকেও পূর্ণ সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হয়েছে।
গ্যাস সংকটে কমেছে ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন
দেশের বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের দৈনিক প্রয়োজন ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টার দিকে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের মোট সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট।
অন্যদিকে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সেখান থেকে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট।
পিডিবির হিসাব বলছে, গ্যাস সংকটেই অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট এবং কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি-সংক্রান্ত সমস্যায় আরও প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতিই দেশজুড়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
এলএনজি সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা
গ্যাস সংকটের পেছনে আরও একটি বড় কারণ হিসেবে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের বিষয়টি সামনে এসেছে। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর দেশে দৈনিক প্রায় ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়।
এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে। টার্মিনালটি মেরামতের পর ৫ আগস্ট রাতে সীমিত পরিসরে আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়।
রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে মোট প্রায় ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহের পরিমাণ ছিল প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট।
সংশ্লিষ্টদের আশা, মেরামতের কাজ শেষ হলে সোমবার রাত ১১টার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে পূর্ণমাত্রায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট সরবরাহ প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তীব্র গরমের মধ্যে লোডশেডিং পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬ । ৯:০৭ অপরাহ্ণ