‘সমন্বিত সিদ্ধান্তে’ বাড়ল সুগন্ধি চালের দাম| বাজারে যোগসাজশের অভিযোগ
‘সমন্বিত সিদ্ধান্তে’ বাড়ল সুগন্ধি চালের দাম| বাজারে যোগসাজশের অভিযোগ
দেশের বাজারে হঠাৎ করেই বেড়েছে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের দাম। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে প্রতি কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে রপ্তানি অনুমতির একটি সরকারি সিদ্ধান্ত, যা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে নেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এক কেজি প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭৫ টাকা। একই সময়ে খোলা সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ১৭০ টাকায়। অথচ মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও, শবেবরাতের আগে এসব চালের দাম ছিল ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকার মধ্যে।
বিক্রেতারা জানান, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই দাম বাড়তে শুরু করে। ঢাকার বাড্ডা এলাকার মুদি দোকানি হারুনুর রশিদ বলেন, স্কয়ার, প্রাণ, আকিজ, সিটি, রূপচাঁদা ও ফ্রেশসহ প্রায় সব বড় ব্র্যান্ড একসঙ্গে দাম বাড়িয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো—সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটে একই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বপ্ন সুপারশপে ঘুরে দেখা গেছে, আকিজের ‘সানশাইন’, স্কয়ারের ‘চাষি’, ইস্পাহানির ‘পার্বণ’, রূপচাঁদা ও প্রাণসহ সব ব্র্যান্ডের এক কেজি সুগন্ধি চালের দাম সমান—১৭৫ টাকা। বিক্রেতারা জানান, আগের দাম ১৫৫ টাকা থাকলেও তখনো সব ব্র্যান্ড একই মূল্য অনুসরণ করেছিল। এতে করে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত মূল্য নির্ধারণ বা যোগসাজশের সন্দেহ জোরালো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতির। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সুগন্ধি চাল রপ্তানির সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করে। এতে ৬১টি প্রতিষ্ঠান পুনরায় রপ্তানির অনুমতি পায়। এর আগে এই অনুমতির মেয়াদ ছিল ডিসেম্বর পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজান সামনে রেখে যখন স্থানীয় বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা বাড়ার কথা, ঠিক তখনই রপ্তানির অনুমতি দেওয়ায় বাজারে সরবরাহ চাপের মুখে পড়ে। এই সুযোগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একযোগে দাম বাড়িয়ে দেয়।
খাদ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। এর মধ্যে স্থানীয় চাহিদা ১২ থেকে ১৫ লাখ টন। একক বছরে রপ্তানির পরিমাণ কখনোই ১০ হাজার টন ছাড়ায়নি। তবুও রপ্তানির অনুমতির সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
সরকার কেজিপ্রতি সুগন্ধি চালের ন্যূনতম রপ্তানি মূল্য নির্ধারণ করেছে ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হারে (ডলারপ্রতি ১২৩ টাকা) যার স্থানীয় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৯৭ টাকা। ফলে রপ্তানিতে উৎসাহ থাকলেও দেশীয় বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুই ধাপে প্রায় ২৪ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত কোটা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারেনি। চালের দাম বাড়ায় ২০২২ সালে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। একই কারণে ২০১৩ সালেও সাময়িকভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি বন্ধ রাখা হয়।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, “সব কোম্পানি যদি একসঙ্গে একই দামে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে সেখানে প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকে না। একেক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও প্যাকেজিং খরচ ভিন্ন হওয়ার কথা। বিষয়টি অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, প্রতিযোগিতা কমিশনের উচিত দ্রুত বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভোক্তারা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হন।
