ঝালকাঠিতে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে পুনরায় চাঁদাবাজির অভিযোগ
ঝালকাঠিতে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে পুনরায় চাঁদাবাজির অভিযোগ
ঝালকাঠি জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একাংশের বিরুদ্ধে আবারও ভয়াবহ চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় এক বছর আগে এই অনিয়ম কিছুটা বন্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা নতুন করে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছে।
প্রাপ্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঝালকাঠি জেলার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। অভিযুক্ত ট্রাফিক সার্জেন্ট হাসানকে রোববার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
এ ঘটনায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও, তারা ট্রাফিক বিভাগের সামগ্রিক কার্যক্রমে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে ভয়াবহ চিত্র
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝালকাঠি শহর ও আশপাশের এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন যানবাহন থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী—
পার্সেল পরিবহন থেকে ৫০০ টাকা
টমটম ও ইজিবাইক থেকে ৫০০ টাকা
ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস থেকে ৩০০ টাকা
দূরপাল্লার প্রতিটি বাস থেকে ৫০০ টাকা
বিভিন্ন কোম্পানির কাভার্ড ভ্যান থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা
এই খাতগুলো থেকে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এছাড়া প্রতিদিন অন্য জেলা থেকে ঝালকাঠিতে প্রবেশকারী পিকআপ ও ট্রাক থেকে ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নগদ অর্থ নেওয়া হয়। কৃষ্ণকাঠি পেট্রোলপাম্প মোড়, কলেজ মোড়, অতিথি কমিউনিটি সেন্টার এলাকা ও ব্র্যাক মোড়কে চাঁদাবাজির প্রধান স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চালকদের অভিযোগ, যানবাহন থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষার নামে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
মূল চক্র এখনও সক্রিয়
যদিও সার্জেন্ট হাসানকে অপসারণ করা হয়েছে, তবে অভিযোগকারীদের দাবি—চাঁদাবাজির মূল নেটওয়ার্ক এখনও বহাল রয়েছে। বর্তমানে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) রহমতকে এই মাসোয়ারা ব্যবস্থার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
তার বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন কোম্পানির পণ্যবাহী গাড়ি, সিএনজি, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহন থেকে মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রহমত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন,
“মিডিয়ায় কথা বলার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিষেধ রয়েছে।”
আরও বিস্তৃত অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ট্রাফিক পুলিশের টিএসআই তুষার দপদপিয়া, রাজাপুর ও কাঠালিয়া এলাকার বিভিন্ন বিট থেকে মাসোয়ারা তুলে থাকেন। অপরদিকে ইউসুফ নামের এক সদস্য শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে কোম্পানির কাভার্ড ভ্যান থেকে নিয়মিত টাকা সংগ্রহ করেন।
সদ্য অপসারিত সার্জেন্ট হাসানের বিরুদ্ধে বাস টার্মিনাল ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এমনকি তিনি সরকারি রিকুইজিশন স্লিপ বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড নেতার দাবি,
“মাসের ৫ তারিখের পর সার্জেন্ট হাসান প্রায় প্রতিদিন ফোন দিয়ে বলতেন—বিটের টাকা দিতে পারলে বাসায় বাজার করা যাবে।”
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন,
“দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। একজনকে ইতোমধ্যে ক্লোজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জনদাবি
সাধারণ জনগণ ও ঝালকাঠির নাগরিক সমাজ দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং ট্রাফিক বিভাগে শৃঙ্খলা ফেরানোর জোর দাবি জানিয়েছেন।
একাধিক চালকের ভাষ্য,
“পুলিশ মামলা না দিয়ে টাকা নেয়, আর না দিলে হয়রানি করে। এই অন্যায় আর কতদিন চলবে?”
